বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পূর্বাভাস এখন শুধু জল্পনা নয়, বরং শক্ত তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাস্তব সম্ভাবনা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিগত অবস্থানের কারণে সোনা আবারও নিরাপদ বিনিয়োগের প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে।
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পূর্বাভাস নিয়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ঊর্ধ্বগতি সাময়িক নয়। বরং চলতি বছর ও আগামী বছর মিলিয়ে সোনার দাম ছয় হাজার থেকে সাত হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বিনিয়োগ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এবং স্বতন্ত্র বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসে একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই সোনার ভবিষ্যৎ দিকেই তাকিয়ে আছে।
Content Summary
- 1 ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সোনার দাম
ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সোনার দাম
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পূর্বাভাসের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সাম্প্রতিক মূল্যরেকর্ড। স্পট মার্কেটে একদিনেই সোনার দাম উঠে যায় ৫ হাজার ৯২ দশমিক ৭০ ডলারে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সোনার দাম ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালেই দাম বেড়েছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে বিরল ঘটনা।
এই মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। শেয়ারবাজার বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের তুলনায় সোনা এখন অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, একবার বড় কোনো মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করলে দাম আরও ওপরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা এখন সোনার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বাজারে আজকের সোনার দাম (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- ২২ ক্যারেট স্বর্ণ (১ ভরি): ২,৫৭,১৯১ টাকা
- মূল্য বৃদ্ধির পরিমাণ: ১,৫৭৪ টাকা
বাজারে সোনার চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক দাম বিবেচনা করে এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালে ৭ হাজার ডলার ছোঁয়ার সম্ভাবনা
লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক জরিপে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। যদিও গড় দাম ধরা হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৭৪২ ডলার, তবু সর্বোচ্চ সীমা নিয়ে আশাবাদী ধারণাই প্রাধান্য পাচ্ছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসও তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করেছে।
আগে যেখানে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলার ধরা হয়েছিল, সেখানে নতুন করে বলা হচ্ছে দাম ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
স্বাধীন বিশ্লেষক রস নরম্যান আরও এক ধাপ এগিয়ে চলতি বছরেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৪০০ ডলারের সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
আরও পড়ুনঃ ২ মাস পর পুনরায় চালু হলো এনআইডি সংশোধন সেবা
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কেন সোনার দাম বাড়াচ্ছে
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পূর্বাভাসের অন্যতম বড় কারণ হলো চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু, বৈশ্বিক শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
মেটালস ফোকাসের পরিচালক ফিলিপ নিউম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে শেয়ারবাজার অতিমূল্যায়িত বলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও বিনিয়োগকারীদের সোনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতিতে সোনা প্রায় সব সময়ই লাভবান হয়।
আরও পড়ুনঃ বিকাশ থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন নেয়ার নিয়ম
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনা বাড়ছে কেন
২০২৫ সালে সোনার দাম বৃদ্ধির পেছনে বড় চালিকাশক্তি ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক সোনা কেনা। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকবে।
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো ডলারনির্ভরতা কমাতে চায়, আর সেই লক্ষ্যেই সোনা তাদের প্রধান বিকল্প।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাসে গড়ে ৬০ টন সোনা কিনতে পারে।
পোল্যান্ড তাদের সোনার মজুত ৫৫০ টন থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টনে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও টানা ১৪ মাস ধরে সোনা কিনেছে, যা বিশ্ববাজারে শক্ত সংকেত পাঠাচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ দুঃখের দিন শেষ! ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন নির্ধারণ করলে সরকার
ইটিএফ ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা
সোনাভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফে বিনিয়োগ বৃদ্ধিও দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আরও কমতে পারে। সুদ কমলে ব্যাংক আমানত বা বন্ডে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম লাভজনক হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা সহজেই সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সোনাভিত্তিক ইটিএফে বিনিয়োগ হয়েছে ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ।
যদিও উচ্চ দামের কারণে গহনার চাহিদা কিছুটা কমেছে, তবু ছোট বার ও কয়েনের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
আরও পড়ুনঃ আ.লীগের স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বনাম বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কোনটি নিবেন
সোনার আকর্ষণ এখন কোথায়
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পূর্বাভাস শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এর পেছনে রয়েছে সোনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
সোনায় বিনিয়োগ করতে হলে কোনো কোম্পানির ব্যালান্স শিট বিশ্লেষণ করতে হয় না, ঋণঝুঁকি বা দেশের রাজনৈতিক ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হয় না।
ভৌত সোনার ক্ষেত্রে একমাত্র ঝুঁকি হলো এর দাম ওঠানামা।
ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি যত জটিল হচ্ছে, সোনার এই সরলতা বিনিয়োগকারীদের কাছে তত বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
সামনে কী হতে পারে সোনার দামে
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে সোনার দামে কিছুটা সংশোধন আসতে পারে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রে সুদ কমানোর প্রত্যাশা হঠাৎ কমে যায় বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা প্রশমিত হয়, তাহলে দাম সাময়িকভাবে নামতে পারে।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের ধারণা, এই পতন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বরং অনেক বিনিয়োগকারী এটিকে নতুন করে সোনা কেনার সুযোগ হিসেবেই দেখবেন।
দীর্ঘমেয়াদে সোনার দামের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা খুবই কম।
আরও পড়ুনঃ বিএনপি ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা | কারা পাবেন, কীভাবে পাবেন সম্পূর্ণ গাইড
FAQs
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সুদের হার কমলে ব্যাংক ও বন্ডে বিনিয়োগ কম আকর্ষণীয় হয়, ফলে সোনার চাহিদা বাড়ে।
স্বল্পমেয়াদে দাম ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সোনা তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত।
উচ্চ দামের কারণে গহনার চাহিদা কমলেও ছোট বার ও কয়েনের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়েছে।
উপসংহার
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পূর্বাভাস বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত সোনাকে আবারও বিনিয়োগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
স্বল্পমেয়াদে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সোনার আকর্ষণ কমার তেমন কারণ দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।
তাই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সোনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করাই এখন অনেকের কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে।
এছাড়াও টেক নিউজ আপডেট নিয়মিত আপনার মোবাইলে পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


