দেশে গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত সর্বত্র এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট।
সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার খবরে পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
দেশে গ্যাস সংকটের মূল কারণ শুধু স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া নয়, বরং চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধান, আমদানিনির্ভরতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে শীত মৌসুমে গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়।
এই লেখায় আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো দেশে গ্যাস সংকট কেন বাড়ছে, এর প্রভাব কোন খাতে সবচেয়ে বেশি পড়ছে এবং কবে নাগাদ সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
Content Summary
দেশে গ্যাস সংকট কেন বাড়ছে
দেশে গ্যাস সংকট বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই ঘাটতির একটি বড় অংশ পূরণ করা হচ্ছে আমদানিকৃত এলএনজির মাধ্যমে। কিন্তু এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলাকালে সেই সরবরাহও সাময়িকভাবে কমে যায়।
এর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলায় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সেই হারে বাড়েনি, ফলে দেশে গ্যাস সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।
এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহ পরিস্থিতি
এলএনজি টার্মিনাল বর্তমানে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলাকালে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কম থাকে।
এই সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মূলত ভবিষ্যতে নিরাপদ ও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যই করা হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, এই সময়টাতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে যায়।
ফলে দেশে গ্যাস সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে আরও বেড়ে যায়, যা সরাসরি ভোক্তাদের ভোগান্তিতে রূপ নেয়।
আরও পড়ুনঃ অনলাইনে নামজারি আবেদন করার নিয়ম
বসতবাড়িতে গ্যাস সংকটের প্রভাব
দেশে গ্যাস সংকটের সবচেয়ে সরাসরি ও দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে বসতবাড়িতে। রাজধানীসহ আশপাশের অনেক এলাকায় সকাল ও সন্ধ্যার সময় চুলায় গ্যাস না থাকার অভিযোগ নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
অনেক পরিবারকে নির্দিষ্ট সময় ধরে রান্না করতে না পারায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
শীত মৌসুমে এই সংকট আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে। রান্না ছাড়াও গরম পানি ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে গ্যাসের প্রয়োজন বাড়ে।
কিন্তু চাপ কম থাকায় অনেক জায়গায় চুলায় আগুনই জ্বলে না। এতে শুধু সময় নষ্ট নয়, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত খরচও বাড়ছে।
এলপিজি বাজারে সংকট ও মূল্যচাপ
পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এলপিজি বাজারেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। মাসের শুরু থেকেই এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি এবং দামের চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শীত মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধি, পরিবহন জটিলতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অনেক এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার পেতে দেরি হচ্ছে, আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
ফলে দেশে গ্যাস সংকটের কারণে যে মানুষ এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন, তারাও পুরোপুরি স্বস্তি পাচ্ছেন না।
আরও পড়ুনঃ ৩৯৯ টাকায় সরকারি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সাথে ফ্রি রাউটার নেয়ার নিয়ম
১২ কেজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম
৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এলপি গ্যাসের নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৩০৬ টাকা। এই নতুন দাম আজ ৪ জানুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা থেকেই সারা দেশে কার্যকর হবে।
এর আগে ডিসেম্বর মাসে একই পরিমাণ এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ছিল ১,২৫৩ টাকা।
বর্তমানে বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কত?
বিইআরসি ডিসেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ১,৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১,৮০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে, যা ভোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সংকটের প্রভাব
দেশে গ্যাস সংকট শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
অনেক শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমাতে হচ্ছে বা শিফট সংখ্যা হ্রাস করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সরবরাহ চেইনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে।
এই বিকল্প জ্বালানি তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দামে পড়তে পারে।
কবে মিলতে পারে স্বস্তি
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হলে সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা হবে।
তবে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান থাকায় দেশে গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটতে সময় লাগতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিকল্প জ্বালানির ওপর জোর না দিলে এই সংকট বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
আরও পড়ুনঃ অবশেষে সোনার দাম কমলো, এখন ভরি কত টাকা?
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়া, দেশীয় উৎপাদন হ্রাস এবং এলএনজি আমদানিনির্ভরতা দেশে গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ।
সাধারণত নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় ধরে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলে।
না, বসতবাড়ির পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
এলপিজি সাময়িক বিকল্প হলেও এটি সম্পূর্ণ স্থায়ী সমাধান নয়, কারণ এটি আমদানিনির্ভর ও ব্যয়বহুল।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার
দেশে গ্যাস সংকট এখন একটি কাঠামোগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শুধু সাময়িক ব্যবস্থায় সমাধান সম্ভব নয়।
এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে, তবে মূল সংকট থেকেই যাবে।
দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিকল্প জ্বালানি উন্নয়ন এবং গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
সচেতন ব্যবহার ও পরিকল্পিত বিনিয়োগই পারে দেশে গ্যাস সংকট ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে।
আরও পড়ুনঃ ফের চালু হচ্ছে এনআইডি সংশোধন কার্যক্রম ২০২৬: জেনে নিন শুরু তারিখ
এছাড়াও টেক নিউজ আপডেট নিয়মিত আপনার মোবাইলে পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।
তথ্যসূত্রঃ যুগান্তর
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


