আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা হওয়া সত্ত্বেও খুচরা বাজারে মাল্টার কেজি ৫২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কেন, ব্যবসায়ীদের কাছে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শনিবার (৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ ব্যাখ্যা চান।
সভায় মাল্টার বর্তমান দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়’।
অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না।’
আমদানি মূল্য ৮৭ টাকা, বিক্রি ৫২০ টাকা
বাংলাদেশ কাস্টমসের হিসাবে, বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে প্রতি কেজি মাল্টা সর্বোচ্চ ৭০ সেন্টের কাছাকাছি দরে আমদানি হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা।
কিন্তু সেই মাল্টা চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি। অর্থাৎ যে ফলের আমদানি মূল্য ৮৭ টাকা, ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে তার দাম বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি।
একইভাবে একটি মাঝারি আকারের মাল্টা যার ওজন ২৩৫ গ্রাম, সেটির দামই পড়ছে ১২২ টাকা ২০ পয়সা।
আরও পড়ুনঃ আগের বিয়ে গোপন করে আবারও বিয়ের রাস্তা বন্ধ হতে যাচ্ছে, কাবিননামায় তথ্য বাধ্যতামূলক করার রুল
শুল্ক-কর ১২২ শতাংশ
বাংলাদেশ কাস্টমসের হিসাবে, কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এতে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও অগ্রিম আয়কর রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আমদানির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি মাল্টার গড় আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা। এর ওপর শুল্ক-কর পড়ে প্রায় ১০৭ টাকা। অর্থাৎ বন্দর থেকে খালাসের সময়ই প্রতি কেজির ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৩ থেকে ১৯৪ টাকা।
মাল্টা আসে হিমায়িত কনটেইনারে। বন্দর থেকে গুদামে নেওয়া, কনটেইনার ও পরিবহনসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয়ে আরও ১০ থেকে ১৫ টাকা যোগ হয়। তাতে সরাসরি হিসাবেই ব্যয় দাঁড়ায় ২০৪ থেকে ২০৯ টাকা কেজি।
তবে আমদানিকারকদের বক্তব্য, পচনশীল পণ্যে এ হিসাবই শেষ কথা নয়। ফল নষ্ট হওয়া, কনটেইনার ও বন্দরসংক্রান্ত খরচসহ সব মিলিয়ে তাঁদের প্রকৃত ব্যয় কেজিতে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত হয়।
আরও পড়ুনঃ অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১০০ জনকে চাকরি দেবে আড়ং, বয়স ১৮ হলেই আবেদন
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টার প্রয়োজন হয়।
উচ্চশুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান আমদানিকারকেরা।
পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
তবে চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, মাল্টার আমদানি কমেনি, বরং বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে মাল্টা ও কমলা আমদানি হয়েছে ২৫ হাজার ৬৬৬ টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ২০ হাজার ৮৮৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৪ হাজার ৭৮০ টন বা ২২ দশমিক ৯ শতাংশ।
পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মাল্টা ও কমলার আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯৫ টন, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৭০ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। চার অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ আমদানির পরিমাণ।
আরও পড়ুনঃ দেশের ক্ষতির অন্যতম কারণ ইউটিউব-ফেসবুক, রাশ টানবে সরকার
ডেঙ্গু প্রকোপে চাহিদা বেড়েছে
দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বেড়েছে মাল্টার চাহিদা ও দাম। চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মাল্টা, কমলাসহ বিভিন্ন ফলের রস খেতে উৎসাহিত করেন। এতে মাল্টার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
খুচরা বাজারে বিদেশি মাল্টা আকার ও মান ভেদে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে দেশি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়।
এক মাস আগেও প্রতি কেজি মাল্টা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা এবং এক সপ্তাহ আগেও ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এক মাসে ফলটির দাম বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং এক সপ্তাহে প্রায় ৪১ শতাংশ।
শুল্ক পর্যালোচনার আশ্বাস
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শোনার পর মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত এলসি খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেন।
আসন্ন রমজান মাসে খেজুরের চাহিদা মেটাতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী জানান, খেজুরের আমদানি শুল্ক নিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
২০২০ সালে চট্টগ্রামে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে সেই ফল এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


