মুঠোফোনের গোপন তথ্য এখন অর্থের বিনিময়ে হাতের নাগালে চলে আসছে। কে কাকে ফোন করেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন, কখন যোগাযোগ করেছেন কিংবা কোন এলাকায় অবস্থান করেছেন, এমন নানা তথ্য টাকা দিলেই সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্যও এভাবে সংগ্রহ করা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে একজন মন্ত্রীর তিন মাসের কল ডিটেইলস রেকর্ড বা সিডিআর অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করা হয়েছে। পরে মন্ত্রীর নিজের মুঠোফোনের তথ্যের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখা হলে রেকর্ড সঠিক বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। একইভাবে সরকারি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান এবং দুজন সাংবাদিকের নম্বরের সিডিআরও সংগ্রহ করে সঠিকতা পাওয়া গেছে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অনলাইনে ওয়েবসাইট, ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে এসব তথ্যের কেনাবেচা চলছে। সিডিআরের পাশাপাশি এনআইডি, অবস্থানের তথ্য, এসএমএস, টিআইএন, পাসপোর্ট এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্যও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নাগরিকের গোপনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
মুঠোফোনের গোপন তথ্য কেনাবেচার ভয়াবহ চিত্র-
টাকা দিলেই মিলছে কল ডিটেইলস ও অবস্থানের তথ্য
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের যেকোনো মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করা সম্ভব বলে অনলাইনে প্রচার করা হচ্ছে। একটি মন্ত্রীর নম্বরের বিপরীতে ৬ সেপ্টেম্বর টাকা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিন মাসের কল ডিটেইলস রেকর্ড পাওয়া যায়। সেখানে কার সঙ্গে কতক্ষণ কথা হয়েছে, কখন যোগাযোগ হয়েছে এবং কলের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোথায় ছিলেন, এমন তথ্যও ছিল।
একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার দুই প্রধানের নম্বর এবং দুই কর্মীর নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হলে সব কটি রেকর্ড সঠিক পাওয়া যায়।
অনলাইনে গড়ে ওঠা এই বাজারে ফেসবুক পোস্ট, ওয়েবসাইট এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সেবার আলাদা মূল্য ও সময়সীমাও উল্লেখ করা থাকে।
আরও পড়ুনঃ মোটরসাইকেলসহ সব গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদে জরুরি বিজ্ঞপ্তি
তিন মাসের সিডিআরের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা
একটি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে দেখা যায়, সেখানে এনআইডি ক্রিয়েট, স্মার্ট এনআইডি ক্রিয়েট, জন্মনিবন্ধন ক্রিয়েট, অটো সাইন কপি, বায়োমেট্রিক অর্ডার, লোকেশন অর্ডার, কললিস্ট, মোবাইল আর্থিক সেবা অ্যাপ এবং পাসপোর্টের এসবি কপি বিক্রির বিজ্ঞাপন রয়েছে।
তিন মাসের সিডিআর পেতে খরচ দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৫০ টাকা। ছয় মাসের সিডিআরের জন্য দিতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকা। ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীরা ক্রেতাদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করে সেখানে যোগাযোগ ও তথ্য আদান প্রদান করেন।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৬০০টির বেশি পোস্টের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য এভাবে সহজে পাওয়া গেলে নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধী চক্র এসব তথ্য ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির চলাফেরা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
আরও পড়ুনঃ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ফোর জি গ্রাহক বেড়েছে ৮৪ লাখ
তথ্য ফাঁসের দায় ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকের কল, এসএমএস, আইএমইআই এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ারের তথ্য সংরক্ষণ করে। আইন অনুযায়ী এসব তথ্যের ব্যবস্থাপনা ও নির্দিষ্ট সংস্থার প্রবেশাধিকার রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা অপারেটরদের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ পায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল বা টেলিগ্রামের মতো অ্যাপের তথ্য সিডিআরে থাকে না।
একটি মোবাইল অপারেটরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তি অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পান। তবে গ্রামীণফোন ও রবি জানিয়েছে, তথ্যভান্ডারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যক্তিরাই এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পান।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি বা ফাঁস হতে দেওয়া যায় না। বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত এমদাদ উল বারীও বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বিটিআরসি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের গত মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, এসব তথ্য বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া নাগরিকের গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এবং তথ্য ফাঁসের সুযোগ তৈরি করা দুর্বলতা দূর করার ওপর জোর দিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ দ্রুত ভিডিও স্ট্রিমিংয়ে গ্রামীণফোনের নতুন উদ্যোগ, ভিডিও লোড হবে আরও দ্রুত
নিয়মিত টেক নিউজ আপডেট মোবাইলে পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


