ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও দিন দিন আরও জটিল ও সংগঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে অন্যের নামে নিবন্ধিত বা প্রি অ্যাক্টিভেটেড মোবাইল সিম এখন সাইবার প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, চাঁদাবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে উঠে এসেছে, অসাধু সিম বিক্রেতা, ডিস্ট্রিবিউটর এবং প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির যোগসাজশে গ্রাহকদের অজান্তেই হাজার হাজার সিম সচল করে কালোবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২২ হাজার সচল সিম উদ্ধার করে একটি প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।
Content Summary
কীভাবে গ্রাহকের আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে সচল করা হচ্ছে একাধিক সিম
তদন্তে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র এই অপরাধ পরিচালনা করছে। কোনো গ্রাহক নতুন সিম নিবন্ধনের জন্য আঙুলের ছাপ দিলে অসাধু বিক্রেতারা কখনও সার্ভার সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে আবারও আঙুলের ছাপ নেন। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার আঙুলের ছাপ নেওয়ার মাধ্যমে একই ব্যক্তির নামে অতিরিক্ত সিম নিবন্ধন করা হয়।
কিছু অসাধু রিটেইলার গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং আঙুলের ছাপের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করে রাখে। পরবর্তীতে সেই তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের অজান্তেই নতুন সিম সক্রিয় করা হয় এবং তা কালোবাজারে বিক্রি করা হয়।
এছাড়া ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে করপোরেট সিম নিবন্ধন, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত সিম পুনরায় চালু করা এবং মৃত ব্যক্তি বা প্রবাসীদের পরিচয় ব্যবহার করেও একই ধরনের প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
কালোবাজারে প্রি অ্যাক্টিভেটেড সিমের বিশাল ব্যবসা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ সিমের বাজারমূল্য ১০০ থেকে ১৫০ টাকা হলেও প্রি অ্যাক্টিভেটেড নিবন্ধিত সিম কালোবাজারে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
যেসব সিমের সঙ্গে বিকাশ, নগদ অথবা রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকে, সেসব সিমের মূল্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া প্রতারক চক্র প্রতি মাসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিত বলে তদন্তে জানা গেছে। তারা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রতারণার পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করত। কেউ ভুয়া বার্তা পাঠাত, কেউ অর্থ সংগ্রহ করত, আবার অন্য একটি দল সেই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করত।
আরও পড়ুনঃ সব হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি রুম বাধ্যতামূলক, নির্দেশ না মানলে লাইসেন্স বাতিল
কোন কোন অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে এসব সিম
প্রি অ্যাক্টিভেটেড সিম ব্যবহার করে প্রতারকরা প্রথমে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলে। এরপর সরকারি অনুদান, লটারি, পুরস্কার অথবা আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
এছাড়া এসব সিম ব্যবহার করে ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে চাঁদা দাবি, মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়ানোর মতো অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে গুজব ছড়ানো এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রেও এসব সিম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ স্টারলিংককে ট্রানজিট হাবের অনুমোদন, দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্র হলো বাংলাদেশ
প্রতারকদের নতুন নতুন কৌশল
প্রতারকরা বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে কল করে দাবি করে যে ভুলবশত আপনার নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে। এরপর ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানায়। অনেকেই ব্যালেন্স যাচাই না করেই নিজের অর্থ পাঠিয়ে প্রতারণার শিকার হন।
আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে জানায় যে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে অথবা আপডেট করা জরুরি। এরপর ওটিপি অথবা গোপন পিন নম্বর সংগ্রহ করে মুহূর্তের মধ্যেই অ্যাকাউন্ট থেকে সব অর্থ তুলে নেয়।
এছাড়াও সরকারি ভাতা, উপবৃত্তি, চাকরি, লটারি, ব্ল্যাকমেইল এবং হানি ট্র্যাপের মতো নানা কৌশলেও প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
ডিবির অভিযানে যা জানা গেছে
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ রাজধানীর লালবাগে অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ২২ হাজার সচল সিম উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের অসাধু সিম বিক্রেতা, ডিস্ট্রিবিউটর এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ এনআইডিতে নাম ও বয়স সংশোধনে নতুন নিয়ম, ৬ ক্যাটাগরির আবেদন সাময়িক স্থগিত
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন
নতুন সিম নিবন্ধনের সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিকবার আঙুলের ছাপ দেবেন না।
সিম নিবন্ধনের পর নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কতটি সিম নিবন্ধিত রয়েছে তা নিয়মিত যাচাই করুন।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওটিপি, পিন নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য কখনোই ফোনে কাউকে জানাবেন না।
অপরিচিত নম্বর থেকে আসা লোভনীয় অফার, পুরস্কার বা অনুদানের বার্তা বিশ্বাস করবেন না।
সন্দেহজনক কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান।
উপসংহার
প্রি অ্যাক্টিভেটেড সিম প্রতারণা এখন শুধু আর্থিক জালিয়াতির বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই সিম নিবন্ধনের সময় সচেতন থাকা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই হতে পারে এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশ ডাক বিভাগের স্পিড পোস্টে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সারাদেশে পার্সেল ডেলিভারি
এছাড়াও টেক নিউজ আপডেট নিয়মিত আপনার মোবাইলে পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


