বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও বিনিয়োগে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সময়মতো নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ যুক্ত করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যান্ডউইথ সংকটের মুখে পড়তে পারে। এতে দেশের ইন্টারনেট সেবা, ডিজিটাল ব্যবসা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। কিন্তু ভিডিও স্ট্রিমিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ব্যান্ডউইথ সংকট মোকাবিলায় এখনই নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শুরু করা জরুরি বলে মনে করছেন প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা। কারণ একটি নতুন সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা থেকে নির্মাণ ও বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। সংকট শুরু হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা
ঢাকার অদূরে আয়োজিত ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক এক কর্মশালায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ইন্টারনেট সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
কর্মশালাটির আয়োজন করে টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা টিআরএনবি। এতে টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
তাদের উপস্থাপনায় বলা হয়, গত এক দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ সালে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস।
২০১৮ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ০.৭৬ টেরাবিটে। ২০২০ সালে ব্যবহার পৌঁছায় ১.৭৮ টেরাবিটে এবং ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৪.২ টেরাবিট।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৬.৮৬ টেরাবিটে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে এই চাহিদা প্রায় ১৩.৫ টেরাবিটে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছরে দেশে ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ।
আরও পড়ুনঃ টেলিটক স্বাধীন সিম এখন মাত্র ৯৯ টাকায়, সঙ্গে বিশেষ ৪৮ টাকার অফার
২০৩৬ সালে ব্যান্ডউইথের চাহিদা পৌঁছাতে পারে ৪৩২ টেরাবিটে
বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথের চাহিদা আরও দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ১৯.১ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ২০২৮ সালে এই চাহিদা প্রায় ২৭ টেরাবিট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০৩০ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৫৪ টেরাবিট। ২০৩৫ সালে তা ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে প্রায় ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।
ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং শিল্পখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার কারণে এই চাহিদা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
আরও পড়ুনঃ টেলিটক বন্ধ সিম অফার ২০২৬: ৩৬ টাকায় মিলবে ১০ দিনের ডাটা ও মিনিট
মাত্র দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হলো সি-মি-উই-৪ এবং সি-মি-উই-৫।
সি-মি-উই-৪ ক্যাবলের সক্ষমতা প্রায় ৪.৬ টেরাবিট এবং সি-মি-উই-৫ এর সক্ষমতা প্রায় ২.৫ টেরাবিট। দেশের বাকি আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা পূরণ করা হয় ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল বা আইটিসির মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি, দুর্ঘটনা বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় চাপ তৈরি হতে পারে।
তুলনামূলকভাবে ভারত ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। মালয়েশিয়ার রয়েছে ২৩টি, থাইল্যান্ডের ১২টি এবং ফিলিপাইনের রয়েছে ১৯টি সংযোগ। সেখানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের সংখ্যা মাত্র দুটি।
আরও পড়ুনঃ ১ বাংলাদেশ ১ ইন্টারনেট ক্যাম্পেইন চালু করল গ্রামীণফোন
নতুন সাবমেরিন ক্যাবল না এলে বাড়তে পারে সংকট
সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের চাহিদা পূরণে সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর অন্যতম কারণ হলো সি-মি-উই-৪ সাবমেরিন ক্যাবলের কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পুরোনো ক্যাবলের সক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চাহিদা মেটাতে বাড়তি অবকাঠামোর প্রয়োজন হবে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশে ব্যান্ডউইথ ঘাটতি প্রায় ২০ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। সময়মতো নতুন সক্ষমতা যুক্ত না হলে ইন্টারনেট সেবার মান ও ডিজিটাল খাতের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হলে পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তন হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ মোবাইল কলের খরচ কমতে পারে, ফ্লোর প্রাইস কমানোর উদ্যোগ বিটিআরসির
বেসরকারি ক্যাবল এলে বাড়বে সক্ষমতা ও কমতে পারে ইন্টারনেটের দাম
প্রস্তাবিত বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলগুলো চালু হলে বাংলাদেশে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এতে দেশের মোট আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
কর্মশালায় সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, নতুন বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল চালু হলে পাইকারি পর্যায়ে ব্যান্ডউইথের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এর প্রভাব খুচরা পর্যায়ের ইন্টারনেট মূল্যেও পড়তে পারে।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবল সংযুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
তার মতে, নতুন ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ল্যাটেন্সি কমবে।
তিনি আরও জানান, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হারও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আরও পড়ুনঃ মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অভিযোগ ৬৬ হাজার ছাড়িয়েছে
ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এখনই সিদ্ধান্ত জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু বর্তমান ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণের নয়। আগামী ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতার কথা মাথায় রেখেই এখন পরিকল্পনা নিতে হবে।
একটি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
এ কারণে ব্যান্ডউইথ সংকট দৃশ্যমান হওয়ার পর নতুন প্রকল্প হাতে নিলে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করতে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের কৌশলগত সমস্যার মুখে পড়তে পারে।
তাদের মতে, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট অবকাঠামো টিকিয়ে রাখতে এখনই আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ নাম বদলে ‘এয়ারটেল’ এখন ‘সার্কেল’
নিয়মিত টেক নিউজ আপডেট মোবাইলে পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


