মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট এখন আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তবে এই সেবা নিয়ে গ্রাহকের মনে জমে থাকা অসন্তোষ কমছে না। নেটওয়ার্ক দুর্বলতা, ধীরগতির ইন্টারনেট, কলড্রপ আর অজান্তে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস চালু করে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ প্রতিনিয়ত উঠছে অপারেটরদের বিরুদ্ধে। এসব কারণে মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অভিযোগ জমা পড়েছে বিপুল সংখ্যায়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হিসাব বলছে, জানুয়ারি ২০২১ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। কলরেট, ডাটার মেয়াদ, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধনসহ নানা বিষয়ে গ্রাহকের এই ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে সংস্থাটির কাছে।
গ্রাহকের এই মতামত ও অভিযোগ সরাসরি শোনার জন্য সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সপ্তম গণশুনানির আয়োজন করে কমিশন। সেখানে কলরেট কমানো, ডাটা প্যাকেজের জটিলতা এবং সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয় বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ। গ্রাহকের অধিকার রক্ষায় এসব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে কমিশন।
কলরেট ও ডাটা প্যাকেজ নিয়ে গ্রাহকের ক্ষোভ
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, চার অপারেটরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে রবির বিরুদ্ধে, সংখ্যায় ২৪ হাজার ৮৭৪টি। এরপরের অবস্থানে আছে গ্রামীণফোন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ২১ হাজার ৫২৬টি। টেলিটকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ১১ হাজার ৫৯৪টি এবং বাংলালিংকের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৭১১টি।
অভিযোগের বেশির ভাগই সেবার মান, ইন্টারনেটের ধীরগতি এবং ভ্যাস-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে। এ ছাড়া মোবাইল নম্বর পরিবর্তন, রিচার্জ ও বিলিং জটিলতা, সিম নিবন্ধন, ট্যারিফ, সিমের মালিকানা এবং প্রতারণা নিয়েও গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন। অপারেটররা দাবি করেছে, তারা বেশির ভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে। রবির ২৪ হাজার ৮৭৪টি অভিযোগের মধ্যে ২৪ হাজার ৮৩৯টি এবং গ্রামীণফোনের ২১ হাজার ৫২৬টির মধ্যে ২০ হাজার ৮৯৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে কাগজে নিষ্পত্তির হার বেশি দেখালেও বাস্তবে সেবার মান ও ইন্টারনেট গতির সমস্যা এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
আরও পড়ুনঃ মহাসড়কে এআই ক্যামেরা বসছে, চাঁদাবাজি কমার আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
অপারেটরভিত্তিক অভিযোগের চিত্র
এবারের গণশুনানিতে অংশ নিতে ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৯৯০ জন নিবন্ধন করেছিলেন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৭২ জন নারী এবং ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী। প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ সংক্রান্ত ছিল ১ হাজার ৪৫টি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগ নিয়ে ছিল ৮৪৪টি।
জামালপুরের একজন অংশগ্রহণকারী কলরেট কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসি জানায়, বর্তমানে ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২ টাকা রয়েছে, তবে গ্রাহকের চাপ কমাতে ফ্লোর প্রাইস কমানোর কাজ চলছে। ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ড ও পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক গতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কমিশন জানায়, সাম্প্রতিক ড্রাইভ টেস্টে কোনো অপারেটরের সেবা নির্ধারিত মানের নিচে পাওয়া যায়নি এবং আগামী মাস থেকে প্রতি মাসে সেবার মান নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুনঃ চিকিৎসকদের ‘ফাঁকি’ রোধে সরকারি হাসপাতালে চালু হলো বায়োমেট্রিক হাজিরা
গণশুনানিতে গ্রাহকের প্রশ্ন
বিদ্যুৎ চলে গেলে কলড্রপ বাড়ে কি না এবং ডাটা প্যাকেজ নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এক অংশগ্রহণকারী। জবাবে বিটিআরসি জানায়, প্রতিটি প্যাকেজের সুবিধা ও শর্ত স্পষ্টভাবে জানানোর নিয়ম রয়েছে এবং সেবার ওপর নজরদারি বাড়াতে নতুন একটি প্ল্যাটফর্মও চালু করা হয়েছে।
এসএমএস মাস্কিং ও আন্তর্জাতিক ওটিপি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কমিশন জানায়, অ্যাপ্লিকেশন থেকে ব্যক্তির কাছে পাঠানো বার্তায় মাস্কিং করা হয় এবং ভবিষ্যতে সব ধরনের এসএমএসকে এর আওতায় আনার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক ওটিপির ক্ষেত্রে আর্থিক ও কারিগরি দুই ধরনের জটিলতা রয়েছে বলেও জানানো হয়।
আরও পড়ুনঃ নাম বদলে ‘এয়ারটেল’ এখন ‘সার্কেল’
নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জ
দেশে বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য ৫৬ হাজার টাওয়ার রয়েছে, তবে চাহিদা মেটাতে আরও প্রায় ১৪ হাজার টাওয়ার প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসি জানায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে।
আইএসপি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জাতীয় ফাইবার গ্রিড চালুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কমিশন জানায়, শক্তিশালী জাতীয় ব্যাকবোন গড়ে তুলতে কয়েক মাস ধরে কাজ চলছে এবং নতুন জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালা কার্যকর হলে একই ফাইবার কেবল দিয়ে একাধিক সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
বিটিআরসির হেল্পলাইন ও ওয়েবসাইটে পাওয়া প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগের মধ্যে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে, তবে এই হারকে যথেষ্ট মনে করছে না কমিশন। আইন অনুযায়ী প্রতি চার মাসে অন্তত একবার গণশুনানি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বিটিআরসির। অপারেটরদের প্যাকেজের দামে পার্থক্যের কারণ হিসেবে কমিশন জানায়, বিভিন্ন অপারেটরের পরিচালন ব্যয় সমান নয়, তাই সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হয়।
মোবাইল সেবার ব্যবহার যত বাড়ছে, গ্রাহকের প্রত্যাশাও তত বাড়ছে। কাগজে অভিযোগের বড় অংশ নিষ্পত্তি দেখানো হলেও বাস্তবে সেবার মান, ইন্টারনেট গতি ও নেটওয়ার্ক কাভারেজ নিয়ে অসন্তোষ থেকেই যাচ্ছে। তাই দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজাই এখন বিটিআরসি ও অপারেটরদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুনঃ বিদ্যুৎ গেলেই অকেজো হয়ে পড়ে টেলিটকের সিমের ইন্টারনেট সেবা
নিয়মিত টেক নিউজ আপডেট মোবাইলে পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।
ভিজিট করুন 👉
━ ━ ━ ━ ━ ━ ━ ━
ডিজিটাল টাচ ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন ।ডিজিটাল টাচ সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুনঃ এই লিংকে।


